জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ;
এবার সীমান্ত দিয়ে সার পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে টেকনাফসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমারে পাচারের সময় বিজিবি ও কোস্টগার্ড বেশ কয়েক দফায় সার আটক করেছে। নতুন করে সার পাচারের খবরে সীমান্তের কৃষকসহ সচেতন মহলের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারে সার পাচার অনেকটা বন্ধ ছিল। এমনকি ওই সময়ে সার পাচার ও আটকের ঘটনাও ছিল বিরল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সার পাচারের ঘটনায় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট এলাকায় সার পাচারে জড়িত চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে কঠোর হাতে দমনের দাবি জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারে সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যে এক ধরনের সংকট চলছে। আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত ওই রাজ্যের কৃষকরা জমিতে সার প্রয়োগ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে পাচারে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারে ইউরিয়া সারের বেশ কদর রয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার টাকা দরে প্রতি বস্তা সার মিয়ানমারের চোরাকারবারীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন এ দেশের চোরাকারবারীরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সারের বস্তা দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রির সুযোগ থাকায় এ দেশের চোরাকারবারীরা সার পাচারে তৎপর হয়ে উঠেছেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালিশহর, পতেঙ্গা, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীকেন্দ্রিক বড় বড় চোরাকারবারীরা সাগরপথে জাহাজ বা ট্রলারে করে মিয়ানমারে সার পাচার করছেন। সমুদ্রপথে সার পাচারের সময় কোস্টগার্ডের হাতে একাধিক চালান আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সাগরপথে জাহাজে করে সার পাচারের ঘটনার পরপরই টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টের চোরাকারবারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় বিজিবি সারসহ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে টেকনাফের দমদমিয়া সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় ৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে বিজিবি। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর একই সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩৫ বস্তা সারসহ একটি হস্তচালিত নৌকা জব্দ করে বিজিবি।
গত ২০ আগস্ট সাবরাং বিওপির জওয়ানেরা নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে ৫৩ বস্তা সারসহ একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা আটক করেন। এদিকে ৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের উদ্দেশে ট্রাকে করে পরিবহনের সময় ৩০০ বস্তা সারের একটি বড় চালান জব্দ করে মরিচ্যা বিজিবি।
৩ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় ৩৪ বিজিবির জওয়ানেরা ৮৮ বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করেন। ১৫ জুলাই রাতে পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় ১৩ বস্তা ইউরিয়া সারসহ চার রোহিঙ্গাকে হাতেনাতে আটক করেন পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা।
১৩ জুলাই পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় ৬৪ বিজিবির অধীনস্থ পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ১৩০ বস্তা সার আটক করেন। ৮ জুলাই পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা আনজুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ইজিবাইকসহ ২২ বস্তা ইউরিয়া সার আটক করেন। ১ জুলাই পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ফারিরবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ এক পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করেন।
এছাড়া চট্টগ্রামের হালিশহর, ভাটিয়ারী, পতেঙ্গা ও কুতুবদিয়া এলাকা দিয়ে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাচারের সময় সারের বেশ কয়েকটি চালান আটক করেছে কোস্টগার্ড।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, গত মাসে (আগস্টে) উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় সার পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, ডিলার পর্যায়ে মনিটরিং বাড়ানো, সারের বস্তার মুখ খোলা রাখা এবং বিকেল ৫টার পর সার বিক্রি না করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
তিনি আরও জানান, সার পাচার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সার পাচার ঠেকানো সম্ভব উল্লেখ করে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দু-এক দিনের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন জানান, সার পাচারসহ যাবতীয় চোরাচালান রোধে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ডের এই মিডিয়া কর্মকর্তা।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম জি. জানান, সার এমন একটি জিনিস, যা পকেটে করে নেওয়া যায় না। কার কার সার প্রয়োজন, সেটাও স্থানীয় লোকজন ভালো করেই জানেন। এছাড়া কৃষকসহ স্থানীয়রা সার পাচার রোধে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
তিনি মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জনসচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
